রোববার বিকেলে ডেট্রয়েটে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণ উদযাপন করতে মানুষ ছবি তোলার জন্য পোজ দিচ্ছেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়েছিল ডেট্রয়েটের পশ্চিম দিকে, ম্যাকগ্রা অ্যাভিনিউ ৭৭০১ নম্বরে অবস্থিত এল রে দে লাস আরেপাস-এ ভেন্তে ভেনেজুয়েলা এবং স্বাধীন ভেনেজুয়েলার আমেরিকান নাগরিকদের দ্বারা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়//Photo : Robin Buckson, The Detroit News
ডেট্রয়েট, ৫ জানুয়ারি : রোববার রাতে ডেট্রয়েটের ‘এল রে দে লাস আরেপাস’ রেস্তোরাঁটি হঠাৎই জনশূন্য হয়ে পড়ে। রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা গ্রাহকরা বাইরে ফুটপাতে জড়ো হয়ে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উল্লাসে মেতে ওঠেন।
ভেনিজুয়েলার জাতীয় রঙ হলুদ, নীল ও লাল পোশাকে সজ্জিত ডেট্রয়েটের ভেনিজুয়েলানদের একটি দল দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির পতাকা, একটি মার্কিন পতাকা এবং স্প্যানিশ ভাষায় লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নেয়। প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল“ভেনিজুয়েলা স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে” সহ বিভিন্ন স্লোগান।
শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় বোমা হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে হেফাজতে নেয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা করা হয়। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভকারী, ডেমোক্র্যাটসহ অনেকেই সমালোচনা করেন। তাঁদের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এল রে দে লাস আরেপাসে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র স্বস্তি।
ফোর্ড মোটর কোম্পানি থেকে সম্প্রতি অবসর নেওয়া ডিয়ারবর্ন হাইটসের বাসিন্দা লিসমার বেরো বলেন, “আমি সতর্কভাবে আশাবাদী। পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লেই প্রকৃত স্বস্তি আসবে। মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা একটি বড় পদক্ষেপ। এই দরজা খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ, তবে শাসনব্যবস্থাটি এখনও পুরোপুরি ভাঙেনি।”
বেরো জানান, তিনি ২০০০ সালের দিকে মিশিগানে চলে আসেন, যখন ভেনিজুয়েলা তখনও তুলনামূলক সমৃদ্ধ ছিল। সে সময় মাদুরোর পূর্বসূরি হুগো শ্যাভেজ একজন বিতর্কিত সমাজতান্ত্রিক নেতা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিউবার স্বৈরশাসক ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে শ্যাভেজকে সমর্থন করতেন না বেরো।
তিনি বলেন, “আমার বাবা-মা খুব অসন্তুষ্ট ছিলেন, কারণ আমি পরিবার ছেড়ে দেশত্যাগ করেছিলাম। সাহস করে চলে এসেছিলাম। ২০ বছরে পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে!”
মিশিগানে বসে বেরো প্রত্যক্ষ করেন কীভাবে ভেনিজুয়েলার সরকার স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেয়, বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করে এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। ২০১৪ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর সহিংসতা, খাদ্য সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক ও প্রাণঘাতী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। “ছাত্র বিক্ষোভকারীদের গুলি করা হয়েছিল এটা ছিল ভয়াবহ,” বলেন বেরো।
এই অস্থিরতাই তাকে ভেনিজুয়েলার স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় করে তোলে। তিনি ভেনিজুয়েলার মানুষের জন্য বিশেষ ক্যাথলিক গণপ্রার্থনার আয়োজন শুরু করেন। প্রথম আয়োজনেই প্রায় ২০০ মানুষের অংশগ্রহণ দেখে তিনি বিস্মিত হন। এরপর থেকে তিনি মাদুরো ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিতে কংগ্রেসে তদবির করেন, মানবিক সহায়তা পাঠানো সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন এবং মিশিগানে বসবাসরত ভেনিজুয়েলানদের ভোটদানের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করেন, যাতে তারা ২০২৩ সালের প্রাইমারিতে ভোট দিয়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনের জন্য বিরোধী প্রার্থী নির্ধারণ করতে পারে।
বেরো জানান, তিনি নিয়মিত তাঁর ভাই ও মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি সামাল দিতে ভূমিকা রাখতে হতে পারে, তবে আশা করছেন দেশটির বিরোধী নেতাদের সঙ্গে কাজ করে গণতন্ত্র পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। তাঁর মতে, এই সপ্তাহান্তটি সঠিক পথচলার কেবল শুরু।
ভেনিজুয়েলায় মাদুরোবিরোধী প্রধান নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে বিচার বিভাগ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেয়। পরে তিনি এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়াকে সমর্থন দেন। নির্বাচনে পরাজয়ের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মাদুরো ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ গত বছর মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
এল রে দে লাস আরেপাসের মালিক হোসে গুতিয়েরেজ বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর মাদুরো একনায়কতন্ত্রের মতো ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেছিলেন, তাই তাঁর পতনে তিনি খুশি। তবে তিনি ভেনিজুয়েলায় কোনো সশস্ত্র আগ্রাসন চান না বলেও উল্লেখ করেন।
তার ছেলে রে গুতিয়েরেজ, যিনি বাবার সঙ্গে ডেট্রয়েটের প্রথম ভেনিজুয়েলান রেস্তোরাঁটি পরিচালনা করেন, বলেন মাদুরোর পতনের ফলে তিনি প্রায় ২০ বছর পর প্রথমবারের মতো ভেনিজুয়েলায় গিয়ে এমন আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার আশা করছেন, যাদের কখনো দেখা হয়নি। রে গুতিয়েরেজ বলেন, “এটা ধীরে ধীরে এগোনোর একটি ভালো পদক্ষেপ। আমি চাই, আমার দেশের মানুষ আবার স্বাধীন হোক।”
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :